Download WordPress Themes, Happy Birthday Wishes

বৈশ্বিক রূপরেখা বদলে দিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম

২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে আলিসা মিলানো নামের এক নারী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে অন্যান্য নারীদের আহ্বান করেন তাদের জীবনে ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানির ঘটনা সম্পর্কে লিখতে ‘মি টু’ হ্যাশট্যাগ (#MeToo) ব্যবহার করে। কয়েকদিনের মধ্যে সারা বিশ্বব্যাপী হাজার হাজার নারীদের প্রতিক্রিয়ায় সমস্বর হিসেবে উচ্চারিত হতে থাকে ‘#মি টু’।

শুরু হয়ে যায় যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে এক বিশ্বব্যাপী আন্দোলনের। বিনোদন জগত থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অঙ্গন, এই আন্দোলন নাড়িয়ে দিয়েছিল সকল ক্ষেত্রকে। এই আন্দোলনের ফলে বেশ কিছু ক্ষমতাবান ব্যক্তির মুখোশের অন্তরালের আসল রূপ যেমন বেড়িয়ে এসেছিল, তেমনি অনেককে যেতে হয়েছিল কারাগারে।

এ যেন নবারুণ ভট্টাচার্যের কবিতায় ঘটে যাওয়া রোষের বিদগ্ধ প্রকাশ— একটা কথায় ফুলকি উড়ে শুকনো ঘাসে পড়লো। একটি সামান্য টুইট বিশ্বব্যাপী এক অসামান্য আন্দোলনের যোগান দিল। এই আন্দোলন এমন অনেক উদাহরণের মধ্যে একটি; দেখিয়েছে কীভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশ্বজুড়ে পরিবর্তন বয়ে আনা, প্রচলিত নিয়মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং মানুষের ক্ষমতায়নে ব্যবহার করা হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন আর কেবল একে অপরের সাথে যোগাযোগ, মিম শেয়ারিং কিংবা গেম খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি একটি শক্তিশালী মঞ্চে পরিণত হয়েছে যেখানে নিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে এবং বৈশ্বিক সমস্যাসহ অন্যান্য বিষয় তুলে ধরা হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নারীদের যোগাযোগের সুবিধাসহ তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার, অব্যক্ত সব চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা এবং সমস্যা মোকাবেলাসহ আরও অনেক বিষয় প্রকাশের জন্য দিয়েছে কণ্ঠস্বর। যারা কিনা এতদিন নিজেদের প্রান্তিক এবং ক্ষমতাহীন বলে মনে করতো তারা এখন সেই জায়গা থেকে বেড়িয়ে এসে তাদের মনের কথা, তাদের যাপিত জীবনের সব গল্প নির্দ্বিধায় প্রকাশ করছে এবং অন্যদের প্রভাবিত করছে।

এটি এখন এমন একটি শক্তিশালী মাধ্যমে পরিণত হয়েছে যেখানে সহজেই সরকার, মানবিক সংস্থা এবং মূলধারার মিডিয়াসহ স্থানীয় এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়।

বাংলাদেশে অসংখ্য সামাজিক সমস্যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে বেড়িয়ে এসেছে। মানুষ বিভিন্ন অন্যায়-অবিচারের বর্ণনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করছে, যা কিনা বিষয়গুলোকে কর্তৃপক্ষের সামনে তুলে ধরছে। এতে করে দ্রুততার সাথে অপরাধীর বিরুদ্ধে সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণের সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যায়।

যেমন সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে বাংলাদেশে ধর্ষণ এবং যৌন নির্যাতনের ঘটনার সংখ্যা বেড়ে গেছে। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে নোয়াখালীতে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের নৃশংস ভিডিও দেখার পর, এর বিরুদ্ধে পুরো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়, যাতে কর্তৃপক্ষ এই জাতীয় অপরাধ ভবিষ্যতে সংঘটন রোধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

সেই সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংঘটিত বেশ কিছু ক্যাম্পেইন মানুষকে অপরাধীর বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে, সেই আওয়াজ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে এবং দেশজুড়ে নারীর প্রতি সহিংসতা বিরোধী চেতনা প্রজ্বলিত করতে সহায়তা করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হল লাইকির #নোমিনসনো (#NoMeansNo) ক্যাম্পেইন।

এছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষকে বিশেষত নারীদের ন্যূনতম মূলধন দিয়ে নিজস্ব ব্যবসা শুরু করার জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে। বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছর ধরে অনলাইন ব্যবসার যে ব্যাপক প্রসার লক্ষ্য করা যাচ্ছে সেখানে মালিকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই হচ্ছে নারী। এটি বাংলাদেশের নারীদের অর্থনীতিতে অবদান রাখার পাশাপাশি তাদের কর্মজীবন ও স্বপ্ন বাস্তবায়নে সক্ষম করে তুলছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্রতিটি মানুষের বিশেষ করে নারীদের উন্নয়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। অনেক নারীকে দেখা যাচ্ছে যে তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে অন্য নারীদের রান্না, আর্ট ইত্যাদি আরও অনেক বিষয়ে অনলাইনে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। এরূপ উদ্যোগ অন্য নারীদেরকেও পরবর্তীতে উদ্যোক্তা হতে উৎসাহিত করছে, যা কিনা ঘরে বসেই সম্ভব।

অন্যান্য সকল প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মতই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের রয়েছে ভাল-মন্দ উভয় দিক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গোপনীয়তা, অতিরিক্ত ব্যবহার এবং সামাজিক সমস্যাসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ সামনে আনলেও এর সাথে এই প্লাটফর্ম বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী কয়েক মিলিয়ন মানুষকে দেখিয়েছে আশার আলো।

মানুষ এখন এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিভিন্ন বিষয়কে আলোচনায় আনার যেমন সুযোগ পাচ্ছে, তেমনি স্বপ্ন দেখতে পারছে একটি সাফল্যমণ্ডিত পেশাজীবনের। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখছে এবং তাদের সুযোগ করে দিচ্ছে একটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় নতুন সব পরিবর্তন বয়ে আনার।